একটি আয়না ভাবুন। তার সামনে দাঁড়ালে আপনার পুরো ছবি তাতে ফুটে ওঠে: চেহারা, পোশাক, হাসি। কেউ আয়নার দিকে আঙুল তুলে বলতে পারে, “এই যে আপনি।” তবু কেউ ভাবে না যে আয়নাটি আপনার জায়গা দখল করে নিয়েছে। আয়নার যা কিছু, সবই আপনার কাছ থেকে পাওয়া।
এই সহজ ছবিটি মাথায় রাখলে একটি পুরোনো আপত্তি বুঝতে অনেক সহজ হবে।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেকে “মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ” বলেছেন। প্রমাণ হিসেবে তাঁরা একটি ইলহাম উদ্ধৃত করেন, যার শব্দগুলো কুরআনের সূরা আল-ফাতহ থেকে নেওয়া:
তাঁদের বক্তব্য: কুরআনের যে আয়াত মহানবী (সা.)-এর জন্য, তা তিনি নিজের জন্য দাবি করেছেন। এটি কি মহানবী (সা.)-এর মর্যাদায় হস্তক্ষেপ নয়?
তিনি নিজে কী বলেছেন?
ইলহামটি তাঁর প্রথম দিকের বই বারাহীনে আহমদীয়া-য় লেখা ছিল। ১৯০১ সালে তিনি একটি ছোট পুস্তিকা লেখেন, এক গলতী কা ইযালা (একটি ভুল ধারণার অপনোদন)। সেখানে তিনি নিজেই এই ইলহামের কথা তুলে বলেছেন, এতে তাঁকে “মুহাম্মদ” ও “রসূল” নামে ডাকা হয়েছে। তারপর ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ কী।
তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর পর নবুওয়তের সব দরজা বন্ধ, কেবল একটি দরজা খোলা: “সীরাতে সিদ্দীকী”, অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেওয়া। যে এই পথে আসে, সে “যিল্ল” বা ছায়া হিসেবে মহানবী (সা.)-এরই নবুওয়তের চাদর পায়। এই মর্যাদা সে নিজের থেকে পায় না, পায় মহানবী (সা.)-এর ঝরনা থেকে; আর তা-ও নিজের গৌরবের জন্য নয়, মহানবী (সা.)-এর গৌরবের জন্য। এ কারণেই আকাশে তার নাম রাখা হয় মুহাম্মদ ও আহমদ। (A Misconception Removed, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৪–৫)
এরপর তিনি স্পষ্ট বলেছেন: তাঁর নবুওয়ত ও রিসালাত কেবল এই কারণে যে তিনি মহানবী (সা.)-এর ছায়া হিসেবে মুহাম্মদ ও আহমদ; নিজের স্বতন্ত্র অধিকারে নয়। আর এই নাম তাঁকে দেওয়া হয়েছে মহানবী (সা.)-এর প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও আত্মবিলোপের কারণে। (পৃষ্ঠা ৫)
শুরুর আয়নার ছবিটি মনে করুন। আয়নায় ছবি ফুটলে আসল মানুষটির মর্যাদা কমে না, বরং প্রমাণ হয় তাঁর আলো কত উজ্জ্বল। এখানেও তেমনি: মহানবী (সা.)-এর আলো এতই শক্তিশালী যে তাঁর এক অনুগত সেবকের মধ্যেও তা প্রতিফলিত হয়েছে।
মাহদীর নাম নিয়ে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী
একজন অনুসারীকে মহানবী (সা.)-এর নামে ডাকা কি নতুন কথা? না। মহানবী (সা.) নিজেই শেষ যুগের সংস্কারক সম্পর্কে বলেছিলেন:
অর্থাৎ মাহদীর নাম যে মহানবী (সা.)-এর নামের সাথে মিলবে, তা মহানবী (সা.)-এরই কথা। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ব্যাখ্যায়, এই মিল শুধু কাগজে লেখা নামের মিল নয়, গুণ ও আত্মার মিল; সেই অর্থেই আকাশে তাঁর নাম মুহাম্মদ ও আহমদ।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কুরআনের আয়াত নিজের ওপর প্রযোজ্য বলা কি কুরআনের অবমাননা নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, কুরআনের শব্দ নিজের দিকে টেনে আনা বড় ধৃষ্টতা। চলুন দেখি। প্রথম কথা, এটি তাঁর নিজের রচনা নয়, ইলহাম; তিনি এটিকে আল্লাহর বাণী হিসেবেই প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় কথা, আয়াতটির মূল অর্থ তিনি কখনো অস্বীকার করেননি। কুরআনে “মুহাম্মদ” বলতে মহানবী (সা.)-ই, এতে তাঁর কোনো দ্বিমত নেই। ইলহামে একই শব্দ এসেছে ছায়া হিসেবে, প্রতিফলন হিসেবে।
এই পুস্তিকার মূল কথাই হলো, যিল্ল বা ছায়া কখনো আসল থেকে স্বাধীন নয়। ছায়ার সব কিছুই আসলের দান; তাই এতে আসলের অবমাননা নয়, বরং তাঁর মহিমার ঘোষণা।
তাহলে কি তিনি মহানবী (সা.)-এর সমান হওয়ার দাবি করলেন?
একেবারেই না। তাঁর ভাষায়, এই মর্যাদা তিনি নিজের থেকে পাননি, পেয়েছেন মহানবী (সা.)-এর ঝরনা থেকে, আর তা মহানবী (সা.)-এর গৌরবের জন্য। যে শিষ্য বলে, “আমার যা কিছু, সব ওস্তাদের দেওয়া”, সে ওস্তাদের সমান হওয়ার দাবি করছে না; সে ওস্তাদের মহত্ত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নিজেকে যিনি “ছায়া” বলেন, তিনি নিজেই স্বীকার করছেন যে আসল আলো অন্য কারো।
এটি কি খাতামান নাবিয়্যীনের পরিপন্থী নয়?
কুরআন মহানবী (সা.)-কে বলেছে “খাতামান নাবিয়্যীন”:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই একই পুস্তিকায় বলেছেন, যে ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর মধ্যে এমনভাবে বিলীন যে তাঁর নাম পায় আর তাঁর চেহারা প্রতিফলিত করে, সে মোহর ভাঙে না; কারণ সে ছায়া হিসেবে সেই মুহাম্মদ (সা.)-ই। তাই মহানবী (সা.)-ই খাতামান নাবিয়্যীন থাকেন। বরং মোহর ভাঙবে তখন, যদি স্বতন্ত্র নবুওয়তের অধিকারী ঈসা (আ.) সশরীরে ফিরে আসেন। (A Misconception Removed, পৃষ্ঠা ৩–৭)
যিনি নিজের সব মর্যাদাকে মহানবী (সা.)-এর দান বলেন, তাঁর দাবি খতমে নবুওয়তকে ভাঙে না, বরং তার মহিমা প্রকাশ করে।
শুরুর আয়নার কথায় ফিরে যাই। আয়না যত পরিষ্কার হয়, ছবি তত স্পষ্ট হয়; কিন্তু আলো আসে সবসময় আসল মানুষটির কাছ থেকে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সারা জীবন এই কথাটিই বলেছেন: তাঁর যা কিছু, সবই তাঁর প্রভু ও নেতা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দান। যে ইলহামকে মহানবী (সা.)-এর আসন দখলের দাবি বলা হয়, তাঁর নিজের ব্যাখ্যায় সেটি আসলে মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর স্বীকারোক্তি।
সংক্ষেপে
- “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ…” শব্দগুলো তাঁর একটি ইলহামে এসেছে, যার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই এক গলতী কা ইযালা-য় দিয়েছেন।
- তাঁর ব্যাখ্যায় এটি “যিল্ল” বা ছায়ার অর্থে: মহানবী (সা.)-এর প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসায় তাঁর গুণের প্রতিফলন, স্বতন্ত্র কোনো মর্যাদা নয়।
- মহানবী (সা.) নিজেই বলেছেন, মাহদীর নাম তাঁর নামের সাথে মিলবে।
- ছায়া আসলের দান; তাই এতে মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা বা খতমে নবুওয়ত কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ হয় না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.