একটি বইয়ের একটি লাইন পড়ে পুরো বই সম্পর্কে রায় দেওয়া কি ন্যায়বিচার? ধরুন কেউ কুরআন থেকে শুধু এই আয়াতটি পড়ল:
পরের আয়াতটি, “যাহারা তাহাদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন” (১০৭:৬), সে পড়ল না। তাহলে সে কী ভুলই না বুঝবে!
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর একটি ইলহাম নিয়েও প্রায় এমনটাই ঘটে।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর হাকীকাতুল ওহী গ্রন্থে লিখেছেন: “আকাশ থেকে অনেক সিংহাসন নেমেছে, কিন্তু তোমার সিংহাসন সবার ওপরে পাতা হয়েছে।” তাঁদের মতে, এতে তিনি নিজেকে সব নবীর ওপরে, এমনকি মহানবী (সা.)-এর ওপরেও স্থান দিয়েছেন।
আসুন, ইলহামটি পুরো প্রসঙ্গসহ পড়ি।
ইলহামটি পুরো প্রসঙ্গে
হাকীকাতুল ওহী-তে ইলহামের ধারাটি এভাবে এসেছে: “সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি তোমাকে মসীহ ইবনে মরিয়ম বানিয়েছেন। তিনি তাঁর কাজের জন্য জিজ্ঞাসিত হন না, মানুষ জিজ্ঞাসিত হয়। আল্লাহ তোমাকে সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। আকাশ থেকে অনেক সিংহাসন নেমেছে, কিন্তু তোমার সিংহাসন সবার ওপরে পাতা হয়েছে। তারা আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চাইবে; শোনো, আল্লাহর দলই শেষে বিজয়ী হবে। ভয় পেয়ো না, তুমিই বিজয়ী হবে…” (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১–৯২)
লক্ষ করুন প্রসঙ্গটি। শুরু হচ্ছে “তোমাকে মসীহ ইবনে মরিয়ম বানিয়েছেন” দিয়ে, আর পরেই আসছে শত্রুদের বিরোধিতা আর আল্লাহর দলের বিজয়ের কথা। অর্থাৎ কথা হচ্ছে তাঁর যুগ নিয়ে, তাঁর বিরোধীদের নিয়ে, আর প্রতিশ্রুত মসীহ হিসেবে তাঁর মর্যাদা নিয়ে। মহানবী (সা.)-এর সাথে তুলনার কোনো কথা এখানে নেই।
একই বইয়ে মহানবী (সা.) সম্পর্কে তাঁর কথা
এবার সেই একই হাকীকাতুল ওহী খুলুন, কয়েক পাতা পরে। সেখানে তিনি লিখছেন:
“আমি সবসময় বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখি, এই আরবী নবী, যাঁর নাম মুহাম্মদ (তাঁর ওপর হাজার হাজার দরূদ ও সালাম), তিনি কত উঁচু মর্যাদার নবী! তাঁর উচ্চ মর্যাদার সীমা জানা সম্ভব নয়, আর তাঁর পবিত্র করার শক্তির পরিমাপ করা মানুষের কাজ নয়।… যে তাওহীদ পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, তিনিই সেই বীর যিনি তা আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনলেন।… তাই আল্লাহ তাঁকে সব নবী এবং পূর্বের ও পরের সবার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।”
তারপর: “তিনিই প্রতিটি কল্যাণের উৎস। যে ব্যক্তি তাঁর অনুগ্রহ স্বীকার না করে কোনো শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে, সে মানুষ নয়, শয়তানের বংশধর।… আমরা কী, আর আমাদের মূল্যই বা কী? আমরা অকৃতজ্ঞ হব যদি স্বীকার না করি যে প্রকৃত তাওহীদ আমরা এই নবীর মাধ্যমেই পেয়েছি, জীবন্ত আল্লাহকে চিনেছি এই কামেল নবীর মাধ্যমে, আর আল্লাহর সাথে বাক্যালাপের সম্মানও পেয়েছি এই মহান নবীর মাধ্যমেই।” (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৮–১১৯)
একই বইয়ের লেখক যখন লেখেন মহানবী (সা.) “সব নবী এবং পূর্বের ও পরের সবার ওপর” শ্রেষ্ঠ, তখন সেই বইয়েরই একটি ইলহামকে মহানবী (সা.)-এর ওপরে নিজের স্থান দাবি হিসেবে পড়া কি ঠিক? একজন লেখক নিজেই নিজের কথার ব্যাখ্যাকারী।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“সবার ওপরে” মানে তো সবাই, মহানবী (সা.)-ও এর মধ্যে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, “সব” শব্দে কোনো ব্যতিক্রম নেই। চলুন দেখি কুরআন এমন শব্দ কীভাবে ব্যবহার করে। আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে বলেছেন:
“সারা বিশ্ববাসীর ওপর শ্রেষ্ঠ”, তবু কোনো মুসলমান মনে করেন না যে বনী ইসরাঈল উম্মতে মুহাম্মদীয়ার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কারণ এই শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তাদের সময়ের মধ্যে। ঠিক তেমনি, হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা বলেছিলেন, “আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দান করিয়াছেন” (সূরা ইউসুফ ১২:৯২)। প্রাধান্য সবসময় একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বোঝা হয়।
এখানে গণ্ডিটি প্রসঙ্গই বলে দিচ্ছে: প্রতিশ্রুত মসীহ হিসেবে তাঁর যুগ ও তাঁর বিরোধীরা। আর তিনি নিজে মহানবী (সা.)-কে রেখেছেন “পূর্বের ও পরের সবার” ওপরে। তাই “সবার ওপরে” কথাটিকে মহানবী (সা.) পর্যন্ত টেনে নেওয়া তাঁর নিজের স্পষ্ট বক্তব্যের বিপরীত।
তাহলে তাঁর মর্যাদা কোথা থেকে, আর কতটুকু?
এর উত্তরও তাঁর একটি ইলহামে আছে: “কুল্লু বারাকাতিন মিন মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ফাতাবারাকা মান আল্লামা ওয়া তাআল্লামা”, অর্থাৎ “প্রতিটি বরকত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে; অতএব কল্যাণময় তিনি যিনি শিখিয়েছেন, আর সে-ও যে শিখেছে।” (তাযকিরা, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৩১২; তোহফায়ে বাগদাদ, রূহানী খাযায়েন, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১–৩১)
শিক্ষক আর ছাত্র। ছাত্র যত উঁচুতেই উঠুক, তার সব জ্ঞান শিক্ষকের দান; ছাত্রের সাফল্য আসলে শিক্ষকেরই গৌরব। যিনি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর ছাত্র বলেন, তিনি শিক্ষকের ওপরে বসার দাবি করেন না।
ইলহাম বলে কি সব আপত্তি এড়িয়ে যাওয়া যায়?
না, আর আমরা তা করছিও না। আমরা ইলহামটিকে তার পুরো প্রসঙ্গে পড়েছি, আর একই লেখকের একই বইয়ের স্পষ্ট বক্তব্যের পাশে রেখেছি। যেকোনো লেখার সঠিক অর্থ বের করার এটাই ন্যায্য পদ্ধতি। একটি লাইনকে আলাদা করে তার এমন অর্থ বানানো, যা লেখক নিজেই বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন, সেটি ব্যাখ্যা নয়।
শুরুর উদাহরণে ফিরে যাই। সূরা মাঊনের একটি আয়াত আলাদা করে পড়লে মনে হয় নামাযীদের নিন্দা করা হচ্ছে; পরের আয়াতটি পড়লে বোঝা যায় নিন্দা আসলে উদাসীন নামাযীদের। লেখাকে তার নিজের প্রসঙ্গে পড়ার এই সাধারণ নিয়মটি আমরা কুরআনের ক্ষেত্রে মানি। সেই একই ন্যায্যতা যে কোনো লেখকের প্রাপ্য, যাঁর একই বইয়ে মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা এত উচ্চকণ্ঠে লেখা আছে।
সংক্ষেপে
- “তোমার সিংহাসন সবার ওপরে” ইলহামটি এসেছে “তোমাকে মসীহ ইবনে মরিয়ম বানিয়েছেন” আর বিরোধীদের পরাজয়ের প্রসঙ্গে (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃষ্ঠা ৯১–৯২)।
- একই বইয়ে তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.) সব নবী এবং পূর্বের ও পরের সবার ওপর শ্রেষ্ঠ, আর তিনিই প্রতিটি কল্যাণের উৎস (পৃষ্ঠা ১১৮–১১৯)।
- কুরআনেও “সবার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব” একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বোঝানো হয়েছে (২:৪৮)।
- তাঁর ইলহাম অনুযায়ী প্রতিটি বরকত মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে; তাই তিনি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর ওপরে রেখেছেন, এ কথা ভিত্তিহীন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.