উনিশ শতকের মাঝামাঝি। লুধিয়ানার কাছে জামালপুর গ্রামে গোলাব শাহ নামে এক আল্লাহপ্রেমী মানুষ থাকতেন। লোকে তাঁকে “মাজযুব” বলত, অর্থাৎ আল্লাহর প্রেমে আত্মভোলা এক দরবেশ। গ্রামের করিম বখশ নামে এক ব্যক্তি প্রায়ই তাঁর কাছে যেতেন।
একদিন গোলাব শাহ এমন কিছু কথা বললেন, যা করিম বখশ তখন বুঝতে পারেননি। বহু বছর পরে, যখন কাদিয়ান থেকে প্রতিশ্রুত মসীহর দাবি উঠল, তখন তাঁর মনে পড়ল সেই পুরনো কথাগুলো।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) বলেছেন, তিনি এসেছেন তাফসীরের কারণে কুরআনে যে ভুলগুলো ঢুকেছে সেগুলো চিহ্নিত করতে। আপত্তিকারীরা রূহানী খাযায়েন ৩য় খণ্ডের ৪৮২ পৃষ্ঠার বরাত দেন, আর বলেন, এতে কুরআনে ভুল আছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু সেই পৃষ্ঠায় কথাটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নিজের দাবি হিসেবে নেই। সেখানে আছে করিম বখশের লিখিত সাক্ষ্য, যেখানে তিনি গোলাব শাহের মুখে শোনা একটি ভবিষ্যদ্বাণী বর্ণনা করেছেন।
মূল বর্ণনাটি প্রসঙ্গসহ
alislam.org-এর “Introducing the Books of the Promised Messiah” প্রবন্ধ জানায়, গোলাব শাহের এই ভবিষ্যদ্বাণীর কথা “ইযালায়ে আওহাম”-এ উল্লেখ করা হয়েছিল, আর ১৮৯২ সালে প্রকাশিত “নিশানে আসমানী” পুস্তকে আরও বিস্তারিত দেওয়া হয়। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, গোলাব শাহ তখন প্রায় ত্রিশ বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।
করিম বখশের বর্ণনার মর্ম এরকম: গোলাব শাহ বললেন, ঈসা এখন যুবক হয়েছেন, তিনি লুধিয়ানায় আসবেন, কুরআনের ভুল বের করবেন এবং কুরআন দিয়ে ফয়সালা করবেন; মৌলভীরা তাঁকে অস্বীকার করবে। করিম বখশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কুরআন তো আল্লাহর বাণী, কুরআনেও কি ভুল আছে?” গোলাব শাহ উত্তর দিলেন, “তাফসীরের ওপর তাফসীর হয়ে গেছে, আর কবিদের ভাষা ছড়িয়ে পড়েছে।”
এরপর গোলাব শাহ জানালেন, ঈসা আছেন কাদিয়ানে। করিম বখশ বললেন, ঈসা ইবনে মারইয়াম নবীউল্লাহ তো আকাশে আছেন। উত্তর এল, তিনি মারা গেছেন, আর আসবেন না। alislam.org-এর প্রবন্ধ অনুযায়ী গোলাব শাহ তিনবার বলেছিলেন যে প্রতিশ্রুত মসীহর নাম গোলাম আহমদ, আর তিনি কাদিয়ানে আসবেন।
এখন বর্ণনাটি আবার পড়ুন। “কুরআনের ভুল” কথাটি শুনে প্রশ্নকারী নিজেই আপত্তি তুলেছিলেন, আর বক্তা নিজেই ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন: ভুল ঢুকেছে তাফসীরে, মানুষের ব্যাখ্যায়, কবিদের কল্পনায়। কুরআনের আয়াতে নয়।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কুরআন সম্পর্কে কী বলতেন
যে বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে আপত্তি তোলা হয়, সেই “ইযালায়ে আওহাম”-এই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজের কলমে লিখেছেন:
“এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে পবিত্র কুরআন আল্লাহর অকাট্য বাণী, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মানুষের যোগ করা এক বিন্দুও এতে নেই। এর শব্দ ও অর্থ আল্লাহর বাণী… প্রতিটি অক্ষর নিজ স্থানে আছে। নিজের অলৌকিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি পরিবর্তন ও সংযোজন থেকে মুক্ত।” (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৮৪; জুমুআর খুতবা, ১৭ মার্চ ২০২৩, alislam.org-এ উদ্ধৃত)
এটিই তাঁর বিশ্বাস, আর এটিই কুরআনের ঘোষণা:
যিনি একই বইয়ে কুরআনকে প্রতিটি অক্ষরে নির্ভুল বলেছেন, তাঁর নামে “কুরআনে ভুল” দাবি চাপানো ন্যায়সংগত নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“তবু তো ‘কুরআনের ভুল’ শব্দগুলো বইয়ে ছাপা হয়েছে?”
হ্যাঁ, ছাপা হয়েছে, তবে একজন সাক্ষীর বর্ণনার অংশ হিসেবে, আর সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাখ্যাসহ। এখানে কেউ কেউ বলেন, ব্যাখ্যা যা-ই হোক, শব্দটি আপত্তিকর। চলুন একটি তুলনা দেখি। আদালতে একজন সাক্ষী যা শুনেছেন, তা হুবহু বলেন, যেন বিচারক নিজে বিচার করতে পারেন। সাক্ষ্য পরিবর্তন করলে সেটি আর সাক্ষ্য থাকে না। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) সাক্ষ্যটি পুরোটাই ছেপেছেন, প্রশ্ন আর উত্তরসহ। প্রশ্নটি বাদ দিয়ে শুধু প্রথম বাক্য তুলে ধরলে বর্ণনার অর্থ বদলে যায়।
“তাফসীরে ভুল আছে, এ কথাই বা কেন বলা হবে?”
তাফসীর মানুষের লেখা; তাতে মতভেদ ও ভুল থাকতে পারে, এ কথা সব আলেমই মানেন। একই আয়াতের বিভিন্ন তাফসীরে পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তাহলে সবগুলো একসঙ্গে সঠিক হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কুরআনের আয়াত দিয়ে দেখিয়েছেন যে ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, অথচ বহু তাফসীরে তাঁকে আকাশে জীবিত বলা হয়েছিল। গোলাব শাহের ভবিষ্যদ্বাণীতেও ঠিক এই বিষয়টি এসেছে: “তিনি মারা গেছেন, আর আসবেন না।” অর্থাৎ “কুরআন দিয়ে ফয়সালা করা” মানে কুরআনের আয়াত দিয়ে মানুষের ভুল ধারণা শুধরে দেওয়া।
“একজন মাজযুবের কথায় ধর্মীয় দলিল হয় কীভাবে?”
এটি ধর্মীয় বিধানের দলিল নয়, আর আহমদীয়া জামাত কখনো একে তা বলেনি। আহমদীয়াতের বিশ্বাসের ভিত্তি কুরআন, সুন্নাহ ও হাদীস। গোলাব শাহের কথাটি একটি সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করা হয়েছে: দাবির বহু বছর আগে একজন আল্লাহওয়ালা মানুষ নাম, স্থান আর ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর কথা বলে গিয়েছিলেন। কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ করা না করা পাঠকের বিষয়, কিন্তু সেই সাক্ষ্যের একটি অংশ কেটে নিয়ে তা দাবিদারের নামে চালিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
সিদ্ধান্ত: বাক্যটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর দাবি নয়, এক সাক্ষীর বর্ণনা। আর সেই বর্ণনাই বলে দেয়, ভুল তাফসীরে, কুরআনে নয়।
সংক্ষেপে
- আপত্তিতে উদ্ধৃত কথাটি করিম বখশের বর্ণনায় গোলাব শাহ নামে এক দরবেশের ভবিষ্যদ্বাণী, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নিজের দাবি নয়।
- একই বর্ণনায় প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, ভুল ঢুকেছে তাফসীরে আর কবিদের কল্পনায়।
- “ইযালায়ে আওহাম”-এই তিনি লিখেছেন, কুরআনের প্রতিটি অক্ষর পরিবর্তন ও সংযোজন থেকে মুক্ত।
- “কুরআন দিয়ে ফয়সালা” মানে কুরআনের আয়াত দিয়ে ভুল ধারণা শোধরানো; তাই আপত্তিটি টেকে না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Introducing the Books of the Promised Messiah (as) · alislam.org
- The Promised Messiah (as): The Unique and Superior Features of The Holy Quran · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.