১৮৮৬ সালের জানুয়ারি মাস। পাঞ্জাবের হুশিয়ারপুর শহরের একটি নির্জন ঘর। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) সেখানে চল্লিশ দিনের জন্য একান্তে ইবাদতে বসেছেন। একে বলে চিল্লা।
উদ্দেশ্য একটাই। সে সময় ইসলামের বিরোধীরা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিল: ইসলাম যদি জীবন্ত ধর্ম হয়, তবে একটি জীবন্ত নিদর্শন দেখাও। তিনি আল্লাহর কাছে সেই নিদর্শনই চেয়েছিলেন।
চিল্লা শেষে, ১৮৮৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, তিনি একটি ইশতেহার প্রকাশ করলেন। তাতে ছিল এক প্রতিশ্রুত পুত্রের সুসংবাদ, যাকে পরে বলা হয়েছে মুসলেহ মওউদ বা প্রতিশ্রুত সংস্কারক।
আপত্তিটি কী?
একটি আপত্তিতে এই সুসংবাদের একটি টুকরো এভাবে তুলে ধরা হয়: “আমি তোমাকে একজন ছেলের সংবাদ দিচ্ছি যার সাথে খোদা প্রকাশিত হবে। কেমন যেন আসমান থেকে খোদা অবতীর্ণ হবে।” সূত্র হিসেবে দেওয়া হয় রূহানী খাযায়েন, ২২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৮-৯৯।
পড়ে মনে হয়, যেন বলা হচ্ছে স্বয়ং আল্লাহ কোনো মানুষের রূপে নেমে আসবেন। একজন মুসলমানের কাছে এমন কথা শোনা কষ্টের। তাই আসল বাক্যটি দেখা দরকার।
পুরো বাক্যটি কী বলে?
ইলহামের এই অংশটি আরবিতে। তার উচ্চারণ: “মাযহারুল আউয়ালি ওয়াল আখিরি, মাযহারুল হাক্কি ওয়াল উলা, কাআন্নাল্লাহা নাযালা মিনাস সামা।”
alislam.org-এ প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদে এর অর্থ এমন: পুত্রটি হবে “আদি ও অন্তের বিকাশস্থল, সত্য ও মহিমার বিকাশস্থল; যেন আল্লাহ আকাশ থেকে নেমে এসেছেন।”
এবার শব্দটি খেয়াল করুন: কাআন্না। আরবিতে এর অর্থ “যেন”, “মনে হবে যেন”। এটি উপমার শব্দ। কেউ যখন বলে “ছেলেটি যেন সিংহ”, তখন কেউ ভাবে না যে ছেলেটি সত্যিই সিংহ হয়ে গেছে।
অর্থাৎ সুসংবাদের কথা হলো: এই পুত্রের কাজে আল্লাহর সাহায্য এত স্পষ্টভাবে দেখা যাবে যে মানুষের মনে হবে, আল্লাহ নিজেই আকাশ থেকে নেমে এসে কাজ করছেন। আপত্তিতে এই “যেন”-টিকে সরিয়ে দিয়ে বাক্যটিকে আক্ষরিক দাবির মতো করে দেখানো হয়েছে।
কুরআনেও এমন ভাষা আছে
আল্লাহ যখন কোনো বান্দার হাত দিয়ে কাজ করেন, তখন সেই কাজকে নিজের কাজ বলে উল্লেখ করেন। বদরের যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে পবিত্র কুরআন বলে:
কংকর ছুড়েছিলেন মহানবী (সা.) নিজের হাতে। তবু আল্লাহ বলছেন, “আমিই ছুড়েছিলাম।” এর অর্থ কেউ এটা করে না যে আল্লাহ মানুষের হাত হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থ হলো, সেই কাজে আল্লাহর শক্তি এত পূর্ণভাবে কাজ করেছিল।
একটি হাদীসে কুদসীতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) জানিয়েছেন, আল্লাহ বলেন:
এই হাদীস পড়ে কোনো আলেম বলেন না যে আল্লাহ মানুষের চোখ-কান হয়ে যান। সবাই বোঝেন, এটি আল্লাহর গভীর সাহায্য আর নৈকট্যের ভাষা। প্রতিশ্রুত পুত্রের সুসংবাদের ভাষাও ঠিক এই ধারার।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“আল্লাহ নেমে আসবেন” বলা কি আল্লাহর মর্যাদার বিরোধী নয়?
কেউ কেউ বলেন, আল্লাহর ক্ষেত্রে “নেমে আসা” কথাটাই আপত্তিকর। চলুন দেখি মহানবী (সা.) নিজে কী বলেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন:
মহানবী (সা.)-এর এই কথাকে কোনো মুসলমান আল্লাহর অবমাননা মনে করেন না। এর অর্থ আল্লাহর রহমত আর সাড়া দেওয়ার বিশেষ সময়। তাহলে “যেন আল্লাহ নেমে এসেছেন”, যেখানে “যেন” শব্দটিও আছে, সেটি আপত্তির বিষয় হয় কীভাবে?
এটি কি পুত্রকে খোদা বানানোর দাবি?
না। ইলহামেই বলা হয়েছে, তিনি হবেন সত্যের বিকাশস্থল, অর্থাৎ যার মাধ্যমে সত্য প্রকাশ পায়। আয়না সূর্যের আলো দেখায়, কিন্তু আয়না সূর্য নয়। আহমদীয়া জামাত কখনো হযরত মুসলেহ মওউদ (রা.)-কে আল্লাহর বান্দা আর মহানবী (সা.)-এর একজন অনুগত সেবক ছাড়া অন্য কিছু মনে করেনি।
এই সুসংবাদ কি পূর্ণ হয়েছিল?
সুসংবাদের মূল দাবি ছিল, এই পুত্রের কাজে আল্লাহর সাহায্য স্পষ্ট দেখা যাবে। হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.) ১৯১৪ সালে খলীফা হন এবং প্রায় বাহান্ন বছর জামাতের নেতৃত্ব দেন। alislam.org-এ প্রকাশিত খুতবায় এই ভবিষ্যদ্বাণী আর তাঁর জীবনের বহু দিক কীভাবে মিলে গেছে, তা বিস্তারিত বলা হয়েছে। একটি ছোট দল থেকে জামাত বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, বহু ভাষায় কুরআনের অনুবাদের কাজ এগিয়েছে। বাহ্যত অসম্ভব কাজ সম্ভব হতে দেখে মানুষের মনে হয়েছে, আল্লাহর হাত এ কাজের পেছনে আছে। ঠিক এটাই ছিল “যেন আল্লাহ নেমে এসেছেন” কথাটির অর্থ।
শেষ কথা
একটি বাক্য থেকে “যেন” শব্দটি বাদ দিলে উপমা দাবিতে পরিণত হয়। কিন্তু ভাষার নিয়ম, কুরআনের উদাহরণ আর মহানবী (সা.)-এর হাদীস একসাথে দেখলে বোঝা যায়, এখানে আল্লাহর সাহায্যের প্রবলতা বোঝানো হয়েছে, আর কিছু নয়।
সংক্ষেপে
- এটি ১৮৮৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির প্রতিশ্রুত পুত্রের সুসংবাদের একটি অংশ।
- মূল আরবিতে আছে “কাআন্নাল্লাহা নাযালা মিনাস সামা”, অর্থাৎ “যেন আল্লাহ আকাশ থেকে নেমে এসেছেন”; এটি উপমা।
- কুরআন (৮:১৮) আর সহীহ বুখারীর হাদীস (৬৫০২) বান্দার কাজে আল্লাহর সাহায্যকে এভাবেই বর্ণনা করে।
- মহানবী (সা.) নিজেই আল্লাহর “নেমে আসার” কথা বলেছেন (বুখারী ১১৪৫), যা কেউ আক্ষরিক অর্থে নেয় না।
- তাই এই ইলহামে আপত্তির কিছু নেই; এটি আল্লাহর বিশেষ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Prophecy of Musleh Maud (the Promised Reformer) · alislam.org
- The Divine Revelation Concerning the Musleh Mau’ood · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.