হজ্জের মৌসুমে কা'বার চারপাশে এক তরুণ তাওয়াফ করছিল। মুখে দোয়ার বদলে সিনেমার গান। পাশে তাওয়াফ করছিলেন একজন, তিনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এ কী করছ? তরুণটি সরলভাবে বলল, কলকাতায় তাদের কাপড়ের দোকান; প্রতিদ্বন্দ্বী দোকানের মালিক হজ্জ করে এসে সাইনবোর্ডে “হাজী” লিখেছে, তাই বাবা তাকে পাঠিয়েছেন, যেন তাদের সাইনবোর্ডেও “হাজী” লেখা যায়।
যিনি এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, তিনি নিজে তখন হজ্জ করছিলেন। তিনি হলেন হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.), আহমদীয়া জামাতের দ্বিতীয় খলীফা। ঘটনাটি হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বরের জুমুআর খুতবায় শুনিয়েছেন (alislam.org)। এই তথ্যটি মনে রাখুন, কারণ আজকের আপত্তির সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক আছে।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: আহমদীরা কাদিয়ানের বার্ষিক জলসাকে “ছায়া হজ্জ” (যিল্লি হজ্জ) মনে করে, আর এর তুলনায় মক্কার হজ্জকে রসহীন বলে। প্রমাণ হিসেবে “পয়গামে সুলহ” পত্রিকার ১৯৩৩ সালের ১৯ এপ্রিলের সংখ্যার একটি লাইন উল্লেখ করা হয়।
এখানে দুটি বিষয় দেখা দরকার। এক, উদ্ধৃতিটি কোথা থেকে এসেছে। দুই, হজ্জ নিয়ে আহমদীয়া মুসলিম জামাতের প্রতিষ্ঠাতা ও খলীফাদের আসল শিক্ষা কী।
উদ্ধৃতিটি কার
প্রথম কথা, এটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর কোনো বই বা বক্তৃতার কথা নয়। তিনি ১৯০৮ সালে ইন্তেকাল করেন; উদ্ধৃতিটি তার পঁচিশ বছর পরের একটি পত্রিকার।
দ্বিতীয় কথা, “পয়গামে সুলহ” আহমদীয়া মুসলিম জামাতের পত্রিকা নয়। এটি লাহোরভিত্তিক সেই দলের মুখপত্র, যারা ১৯১৪ সালে খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে “আহমদীয়া আঞ্জুমানে ইশাআতে ইসলাম” নামে পৃথক সংগঠন গড়ে তোলে। একই নামের একটি পুস্তিকা হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ১৯০৮ সালে লিখেছিলেন, যা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে শান্তির আহ্বান; কিন্তু উদ্ধৃতিটি সেই পুস্তিকার নয়, পরের পত্রিকার।
কোনো জামাতের বিশ্বাস জানতে হলে তার প্রতিষ্ঠাতার লেখা আর তার নেতৃত্বের বক্তব্য দেখতে হয়, অন্য সংগঠনের পত্রিকা নয়।
হজ্জ নিয়ে হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর শিক্ষা
“কিশতিয়ে নূহ” পুস্তকের “আমাদের শিক্ষা” অংশে তিনি তাঁর জামাতকে লিখেছেন:
“পাঁচ ওয়াক্ত নামায এমন ভয় ও পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে আদায় করো, যেন তোমরা আল্লাহকে দেখছ। আল্লাহর জন্য আন্তরিকভাবে রোযা রাখো। যার ওপর যাকাত ফরয, সে যেন যাকাত দেয়। আর যার ওপর হজ্জ ফরয হয়েছে এবং কোনো বাধা নেই, সে যেন হজ্জ করে। সৎকাজ সুন্দরভাবে করো, আর মন্দকে ঘৃণাভরে ত্যাগ করো। মনে রেখো, তাকওয়াশূন্য কোনো আমল আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না।” (Noah's Ark, “Our Teaching”, alislam.org; কিশতিয়ে নূহ, রূহানী খাযায়েন ১৯তম খণ্ড, পৃ. ১৫)
অংশটির শিরোনামই “আমাদের শিক্ষা”, অর্থাৎ এটি জামাতের জন্য প্রতিষ্ঠাতার নিজের লেখা মৌলিক নির্দেশনা। এখানে কোনো ছায়া বা বিকল্পের কথা নেই।
এখানে হজ্জকে নামায, রোযা আর যাকাতের পাশে ইসলামের ফরয ইবাদত হিসেবেই রাখা হয়েছে, ঠিক যেমন কুরআন বলেছে:
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“তবু কি জলসা সালানাকে আহমদীরা হজ্জের মতো পবিত্র মনে করে না?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, পত্রিকা যারই হোক, আহমদীদের আচরণে জলসার প্রতি এমন ভক্তি দেখা যায়। চলুন জামাতের বর্তমান ইমামের কথাই শুনি। ওপরে উল্লেখিত খুতবায় তিনি বলেছেন:
“আমরা, নাউযুবিল্লাহ, বলি না যে জলসার মর্যাদা হজ্জের মতো, যেমন আমাদের কিছু বিরোধী অভিযোগ করে যে আমরা কাদিয়ানে গিয়ে একে হজ্জের মর্যাদা দিই। এটা ভুল… জলসা কোনো ইবাদত নয়, তবে নিশ্চিতভাবেই আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি প্রশিক্ষণ শিবির।” (জুমুআর খুতবা, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬, alislam.org)
এর চেয়ে স্পষ্ট কথা আর হতে পারে না। জলসা ইবাদত নয়; হজ্জ ইবাদত, আর ফরয ইবাদত।
“তাহলে জলসার কথা বলতে গিয়ে হজ্জের উদাহরণ টানা হয় কেন?”
সেই খুতবায় হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) হজ্জের আয়াত (সূরা আল-বাকারা ২:১৯৮) থেকে শিক্ষা নিয়েছেন: হজ্জের সময় অশ্লীলতা, অবাধ্যতা ও ঝগড়া নিষেধ। তিনি বলেছেন, বড় সমাবেশে যেন আহমদীরাও এই কুরআনী নীতিগুলো মেনে চলেন। হজ্জের সেই আয়াতই শেষ হয়েছে এই কথায়: “…এবং তোমরা পাথেয় লইও, স্মরণ রাখিও, আল্লাহ্র তাক্ওয়া হইতেছে সর্বোত্তম পাথেয়।…” অর্থাৎ হজ্জ এখানে আদর্শ, আর জলসা সেই আদর্শ থেকে শেখার জায়গা। আদর্শকে সামনে রেখে শেখা মানে আদর্শকে ছোট করা নয়।
“মক্কার হজ্জকে ‘রসহীন’ বলার ধারণা কোথা থেকে আসতে পারে?”
আহমদীয়া শিক্ষায় যে কথা বারবার এসেছে তা হলো, তাকওয়া ছাড়া কোনো আমল আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। কুরআন কুরবানী সম্পর্কেও বলেছে, এর মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৩৮)। সাইনবোর্ডে “হাজী” লেখার জন্য হজ্জ করা ওই তরুণের উদাহরণ এই কথাই বলে: সমস্যা হজ্জে নয়, নিয়তের অভাবে। হজ্জকে প্রাণহীন বলা আহমদীয়াতের শিক্ষা নয়; প্রাণহীন হজ্জ থেকে সতর্ক করাই এর শিক্ষা। আর দ্বিতীয় খলীফা (রা.) নিজে মক্কায় গিয়ে হজ্জ করেছেন, যা ওই ঘটনা থেকেই জানা যায়।
সিদ্ধান্ত: “ছায়া হজ্জ” আহমদীয়া মুসলিম জামাতের কোনো পরিভাষা বা বিশ্বাস নয়। হজ্জ ফরয, মক্কাই তার একমাত্র স্থান, আর জলসা আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের একটি সমাবেশ মাত্র।
সংক্ষেপে
- উদ্ধৃতিটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নয়, তাঁর ইন্তেকালের পঁচিশ বছর পরের এক পত্রিকার, যা আহমদীয়া মুসলিম জামাতের মুখপত্রও নয়।
- “কিশতিয়ে নূহ”-এ তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যার ওপর হজ্জ ফরয এবং বাধা নেই, সে যেন হজ্জ করে।
- জামাতের ইমাম স্পষ্ট বলেছেন, জলসাকে হজ্জের মর্যাদা দেওয়া হয় না; জলসা ইবাদতও নয়।
- আহমদীয়াতের জোর হজ্জসহ প্রতিটি ইবাদতে তাকওয়ার ওপর; তাই আপত্তিটি ভিত্তিহীন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Jalsa Salana Germany 2016, Friday Sermon 2 September 2016 · alislam.org
- Noah's Ark: Our Teaching · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.