“নুযূল” মানে কি সবসময় আকাশ থেকে নামা?

কুরআন বলে, আল্লাহ লোহা “নাযিল” করেছেন, পশু “নাযিল” করেছেন, এমনকি মহানবী (সা.)-কেও। একটি শব্দের ব্যবহার দেখলেই বোঝা যায় এর আসল অর্থ।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

মহানবী (সা.)-এর হজ্জের সফর। কুরবানির দিন, তিনি তখন মিনায়। সাহাবীদের (রা.) উদ্দেশে তিনি জানিয়ে দিলেন, পরের মঞ্জিলে তাঁরা কোথায় যাত্রাবিরতি করবেন:

نَحْنُ نَازِلُونَ غَدًا بِخَيْفِ بَنِي كِنَانَةَ حَيْثُ تَقَاسَمُوا عَلَى الْكُفْرِ
“আগামীকাল আমরা খাইফে বনী কিনানায় অবতরণ করব (নাযিল হব), যেখানে তারা কুফরের ওপর শপথ করেছিল।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুল হাজ্জ, হাদীস ১৫৯০ (একই ঘটনার আরেক বর্ণনা হাদীস ১৫৮৯-এ)

খাইফে বনী কিনানা মক্কার কাছেই একটি উপত্যকা। মহানবী (সা.) আর তাঁর সাহাবীরা সেখানে যাবেন উট আর পায়ে হেঁটে, মাটির পথ ধরে। তবুও তিনি বললেন, “আমরা নাযিল হব।”

এই ছোট্ট ঘটনাটি একটি বড় প্রশ্নের উত্তর দেয়। হাদীসে আছে, শেষ যুগে “ইবনে মরিয়ম নাযিল হবেন”। অনেকে বলেন, “নাযিল” মানেই আকাশ থেকে নামা, তাই ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত আছেন। অথচ মহানবী (সা.) নিজে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে অবস্থান নেওয়ার অর্থে।

হাদীসে “নুযূল”

আরও একটি উদাহরণ। হযরত আবু বকর (রা.)-এর কন্যা হযরত আসমা (রা.) যখনই মক্কার হাজূন এলাকা দিয়ে যেতেন, বলতেন: “আল্লাহ মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরূদ বর্ষণ করুন। আমরা তাঁর সাথে এখানে অবতরণ করেছিলাম (নাযালনা)” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল উমরাহ, হাদীস ১৭৯৬)।

সফরের কাফেলা কোথাও থামলে, সেটাও “নাযিল” হওয়া। আরবি ভাষায় তাই মুসাফিরের যাত্রাবিরতির জায়গাকে বলা হয় “মানযিল”। আমাদের বাংলাতেও “মঞ্জিল” শব্দটি এসেছে এখান থেকেই।

কুরআনে “নুযূল”

এবার কুরআনের দিকে তাকাই। কুরআন থেকে বেশ কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। প্রথমটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একজন রসূল সম্পর্কে:

قَدۡ اَنۡزَلَ اللّٰہُ اِلَیۡکُمۡ ذِکۡرًا رَّسُوۡلًا یَّتۡلُوۡا عَلَیۡکُمۡ اٰیٰتِ اللّٰہِ مُبَیِّنٰتٍ
“…আল্লাহ্ নিশ্চয় তোমাদের প্রতি নাযেল করিয়াছেন এক স্মারক- এক রসূল, যে তোমাদের নিকট আল্লাহ্‌র সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করে…”
সূরা আত-তালাক ৬৫:১১-১২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৬৫:১০-১১।

এই রসূল হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি মক্কায় জন্মেছেন, সেখানেই বড় হয়েছেন। তবুও আল্লাহ বলছেন, তিনি তাঁকে “নাযিল” করেছেন।

লোহার কথা শুনুন: “এবং আমরা লৌহ নাযেল করিয়াছি, যাহাতে ভীষণ যুদ্ধের উপকরণ আছে এবং মানব জাতির জন্য বহুবিধ উপকার রহিয়াছে” (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৬)। লোহা আমরা খনি থেকে তুলি।

গৃহপালিত পশুর কথা: “এবং তিনি তোমাদের জন্য গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুসমূহের মধ্য হইতে আট জোড়া নাযেল করিয়াছেন” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৭)। গরু, ছাগল, ভেড়া, উট মায়ের পেটে জন্মায়।

পোশাকের কথা: “হে আদম সন্তানগণ! আমরা তোমাদের জন্য এমন পোশাক নাযেল করিয়াছি, যাহা তোমাদের লজ্জাস্থান সমূহকে আবৃত করে” (সূরা আল-আ’রাফ ৭:২৭)। পোশাক তৈরি হয় তুলা আর তাঁতে।

✦

লক্ষ করার মতো আরেকটি বিষয় আছে। কুরআন যখন সত্যিই ওপর থেকে কিছু নামার কথা বোঝাতে চায়, তখন তা স্পষ্ট বলে দেয়। বৃষ্টির কথা দেখুন:

وَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءً طَہُوۡرًا
“…এবং আমরা মেঘ হইতে বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার পানি বর্ষণ করি,”
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৪৯

এখানে আরবিতে স্পষ্ট লেখা মিনাস সামা, অর্থাৎ ওপর থেকে, মেঘ থেকে। কিন্তু মহানবী (সা.), লোহা, পশু বা পোশাকের বেলায় এই শব্দ নেই। আর ইবনে মরিয়মের আগমনের হাদীসেও নেই।

আর একটি আয়াতে আল্লাহ সবকিছুর জন্য একসাথে বলেছেন:

وَاِنۡ مِّنۡ شَیۡءٍ اِلَّا عِنۡدَنَا خَزَآئِنُہٗ ۫ وَمَا نُنَزِّلُہٗۤ اِلَّا بِقَدَرٍ مَّعۡلُوۡمٍ
“এবং এমন কোন বস্তু নাই যাহার (অফুরন্ত) ভাণ্ডার সমূহ আমাদের নিকট নাই এবং আমরা কেবল নিরূপিত পরিমাণ ব্যতিরেকে উহা অবতীর্ণ করি না।”
সূরা আল-হিজর ১৫:২২

এখান থেকে সিদ্ধান্ত হলো: প্রকৃতির সবকিছুই আল্লাহর দান, আল্লাহর পক্ষ থেকে “অবতীর্ণ”, অথচ কোনোটিই আকাশ থেকে খসে পড়ে না। এগুলোর সৃষ্টি হয় এই পৃথিবীতেই। তাই মসীহের আগমনের জন্য যখন “নুযূল” শব্দ ব্যবহার হয়, এর অর্থও ভিন্ন হতে পারে না। এটি তাঁর গুরুত্ব, বরকত আর আধ্যাত্মিক মর্যাদা বোঝায়, আকাশ থেকে দেহসহ নামা নয়।

এখান থেকে একটি সহজ মাপকাঠি পাওয়া যায়। কোনো কিছু আল্লাহর দান, আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো, এটা বোঝাতে কুরআন “নাযিল” বলে। আর কোথা থেকে, সেটা জানানো জরুরি হলে আলাদা করে বলে দেয়। ইবনে মরিয়মের হাদীসে যেহেতু “কোথা থেকে” বলা নেই, তাই শব্দটির অর্থ সেটাই থাকে, যা মহানবী (সা.)-এর আগমনের বেলায়: আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হওয়া।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

কুরআন তো আকাশ থেকেই নাযিল হয়েছে। তাহলে “নাযিল” শব্দে ওপর থেকে আসার অর্থ কি থাকে না?

কুরআন নাযিল হয়েছে আল্লাহর কাছ থেকে, ফেরেশতার মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর হৃদয়ে। কেউ আকাশ থেকে কাগজের পাতা পড়তে দেখেননি। তাই এখানেও শব্দটির মূল ভাব হলো “আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা”, কোনো শারীরিক উচ্চতা থেকে পতন নয়। আর মহানবী (সা.), লোহা, পশু, পোশাক, কারো জন্যই কুরআনে “আকাশ থেকে” কথাটি যোগ করা হয়নি। ঈসা (আ.)-এর আগমনের হাদীসেও “আকাশ থেকে” কথাটি নেই। শব্দটি যেখানে নেই, সেখানে তা যোগ করে অর্থ বদলানো যায় না।

মানুষের জন্য “নাযিল” শব্দ কি সত্যিই সাধারণভাবে ব্যবহার হয়?

হ্যাঁ, এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই। ওপরের দুটি সহীহ হাদীসে মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে অবস্থান নেওয়াকে বলা হয়েছে “নাযিল হওয়া”। আরবি ভাষায় অতিথিকে বলা হয় “নাযিল”, আর অতিথির আপ্যায়নকে “নুযুল”। তাই “ইবনে মরিয়ম তোমাদের মাঝে নাযিল হবেন” কথাটির স্বাভাবিক অর্থ: আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন তোমাদের মাঝে এসে অবস্থান নেবেন। হাদীস নিজেই বলে দিয়েছে তিনি কে: “তোমাদের ইমাম তোমাদেরই মধ্য থেকে” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪৯)।

সংক্ষেপে

  1. মহানবী (সা.) সফরে এক জায়গায় গিয়ে থামাকে বলেছেন “নাযিল হওয়া” (সহীহ বুখারী ১৫৯০, ১৭৯৬)।
  2. কুরআনে মহানবী (সা.), লোহা, গৃহপালিত পশু ও পোশাক, সবই “নাযিল” করা হয়েছে, অথচ কোনোটিই আকাশ থেকে পড়েনি।
  3. “নুযূল” মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা, যা মর্যাদা ও বরকত বোঝায়।
  4. তাই “ইবনে মরিয়ম নাযিল হবেন” কথাটি ঈসা (আ.)-এর আকাশে জীবিত থাকার প্রমাণ নয়।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.