ইমাম মাহদীর নাম কী হবে?

হাদীস বলেছে, তাঁর নাম মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মিলে যাবে। কিন্তু ‘মিলে যাওয়া’ মানে কী? আর একই প্রতিশ্রুত মানুষকে হাদীস কেন কখনো ‘ঈসা ইবনে মারইয়াম’, কখনো ‘মাহদী’ বলেছে?

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

কারো বাবা যখন ছেলেকে বলেন, “তুই তো একদম আমার মতো হয়েছিস”, তখন তিনি চেহারার কথা বলছেন না, নামের কথাও না। তিনি বলছেন স্বভাব, চালচলন, মনের কথা। মিল অনেক রকমের হয়।

শেষ যুগের প্রতিশ্রুত সংস্কারকের নাম নিয়েও হাদীসে এমনই একটি “মিলের” কথা এসেছে। অনেকে ধরে নেন, ইমাম মাহদীর নাম হবে হুবহু “মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ”। চলুন দেখি, হাদীস আসলে কী বলে।

হাদীসের শব্দটি: “ইউওয়াতিউ”

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, পৃথিবীর যদি মাত্র একটি দিনও বাকি থাকে, আল্লাহ সেই দিনকে দীর্ঘ করবেন:

حَتَّى يَبْعَثَ فِيهِ رَجُلاً مِنِّي أَوْ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يُوَاطِئُ اسْمُهُ اسْمِي وَاسْمُ أَبِيهِ اسْمَ أَبِي
“…যতক্ষণ না তিনি তাতে আমার মধ্য থেকে, অথবা আমার আহলে বাইত থেকে এমন একজনকে পাঠান, যার নাম আমার নামের সঙ্গে মিলে যাবে এবং যার পিতার নাম আমার পিতার নামের সঙ্গে মিলে যাবে।”
সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮২

এখানে মূল আরবি শব্দটি হলো “ইউওয়াতিউ”। এর অর্থ মিলে যাওয়া, সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া। হাদীসে বলা হয়নি “তাঁর নাম হবে মুহাম্মদ”। বলা হয়েছে, তাঁর নাম মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মিলবে।

আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। ইমাম আবু দাউদ (রহ.) এই হাদীসের কয়েকটি সূত্র একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। হযরত সুফিয়ান (রহ.)-এর বর্ণনায় শুধু আছে, “আমার আহলে বাইতের একজন আরবদের শাসন করবেন, যার নাম আমার নামের সঙ্গে মিলবে।” পিতার নামের কথা সেখানে নেই। আর ইমাম আবু দাউদ নিজেই বলেছেন, আরও দুজন বর্ণনাকারীর শব্দ সুফিয়ানের বর্ণনার মতোই। অর্থাৎ “পিতার নাম” অংশটি সব বর্ণনায় একরকম নয়।

মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমন

নামের এই মিলের গভীর অর্থ বুঝতে হলে আমাদের সূরা আল-জুমুআর দিকে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলছেন, তিনি উম্মী আরবদের মধ্যে একজন রসূল পাঠিয়েছেন। তারপরের আয়াতে বলছেন:

وَّاٰخَرِیۡنَ مِنۡہُمۡ لَمَّا یَلۡحَقُوۡا بِہِمۡ ؕ وَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ
“এবং (তিনি তাহাকে আবির্ভূত করিবেন) তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও যাহারা এখন পর্যন্ত তাহাদের সঙ্গে মিলিত হয় নাই। এবং তিনি মহাপ্ররাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।”
সূরা আল-জুমুআ ৬২:৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬২:৩।

অর্থাৎ মহানবী (সা.) পরবর্তী এক যুগের মানুষের মধ্যেও “আবির্ভূত” হবেন। সাহাবীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এরা কারা? হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনবার প্রশ্ন করার পর মহানবী (সা.) পাশে বসা হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর গায়ে হাত রেখে বললেন:

لَوْ كَانَ الإِيمَانُ عِنْدَ الثُّرَيَّا لَنَالَهُ رِجَالٌ ـ أَوْ رَجُلٌ ـ مِنْ هَؤُلاَءِ
“ঈমান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রপুঞ্জের কাছেও চলে যায়, তবুও এদের মধ্য থেকে কিছু মানুষ, অথবা একজন মানুষ, তা পেয়ে যাবে।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, সূরা আল-জুমুআ, হাদীস ৪৮৯৭

মহানবী (সা.) নিজে তো সশরীরে আবার আসবেন না। তাহলে “তাদের মধ্যেও আবির্ভূত হবেন” কথার অর্থ কী? অর্থ হলো, তাঁর এমন এক পূর্ণ অনুসারী আসবেন, যাঁর মধ্যে তাঁরই রং, তাঁরই শিক্ষা, তাঁরই আত্মা প্রতিফলিত হবে। যেন মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক দ্বিতীয় আগমন।

এবার নামের হাদীসটি আবার পড়ুন। যিনি মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে আসবেন, তাঁর নাম তো মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মিলবেই। কারণ তিনি নিজের পরিচয়ে নয়, তাঁর প্রভুর পরিচয়েই পরিচিত হবেন।

✦

আহমদ: মহানবী (সা.)-এর আরেক নাম

এবার বাহ্যিক নামের দিকেও তাকানো যাক। কুরআনে হযরত ঈসা (আ.)-এর মুখে একটি সুসংবাদ আছে:

وَمُبَشِّرًۢا بِرَسُوۡلٍ یَّاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِی اسۡمُہٗۤ اَحۡمَدُ
“…এবং এমন এক রসূলেরও সুসংবাদ দাতা রূপে যে আমার পরে আসিবে, যাহার নাম হইবে আহ্‌মদ।…”
সূরা আস-সাফ ৬১:৭

“আহমদ” মহানবী (সা.)-এরই নাম। আর প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবিকারীর নাম মির্যা গোলাম আহমদ। তাঁর নামের মূল অংশই “আহমদ”। আলইসলাম ডট অর্গের একটি প্রবন্ধে প্রতিশ্রুত মসীহর চিহ্ন হিসেবে উল্লেখ আছে যে, তাঁর নাম মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, আর সূরা আস-সাফের এই আয়াতটিও সেখানে উদ্ধৃত হয়েছে।

অর্থাৎ বাহ্যিক দিক থেকেও নাম মিলেছে, আর আধ্যাত্মিক দিক থেকেও। হাদীসের “ইউওয়াতিউ” শব্দটি এই দুই মিলকেই সুন্দরভাবে ধারণ করে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“নাম মিলবে মানে তো নাম হুবহু ‘মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ’ হবে?”

এখানে কেউ কেউ বলেন, হাদীসের সরল অর্থ হলো নাম হুবহু এক হবে। চলুন দেখি। হাদীসের শব্দ “ইউওয়াতিউ”, যার অর্থ মিলে যাওয়া বা সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া। তা ছাড়া আমরা দেখেছি, পিতার নামের অংশটি সব বর্ণনায় নেই।

সবচেয়ে বড় কথা, ইসলামের চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে “মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ” নামের একাধিক মানুষ মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন, এবং ইতিহাস তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে। শুধু নাম মিলিয়ে কেউ মাহদী হয় না। মাহদী চেনা যায় তাঁর কাজ, তাঁর সময় আর আল্লাহর সাহায্য দেখে।

“হাদীসে তো আগমনকারীর নাম ‘ঈসা ইবনে মারইয়াম’, তাহলে মাহদী আলাদা কেউ নন?”

এটি খুব ভালো প্রশ্ন, আর এর উত্তরেই নামের রহস্যটা খুলে যায়। একই প্রতিশ্রুত মানুষকে হাদীস বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে ডেকেছে: কোথাও “ঈসা ইবনে মারইয়াম”, কোথাও “মাহদী”, কোথাও এমন একজন “যার নাম আমার নামের সঙ্গে মিলবে”। সুনান ইবনে মাজাহতে তো এমন একটি বর্ণনাও আছে: “ঈসা ইবনে মারইয়াম ছাড়া আর কোনো মাহদী নেই” (কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৩৯)। এর সনদকে কোনো কোনো হাদীস-বিশারদ দুর্বল বলেছেন, তবু এতে একটি দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষ্য আছে।

এসব নাম আসলে পরিচয়পত্রের নাম নয়, বরং গুণ আর ভূমিকার নাম। “ঈসা” নাম বোঝায়, তিনি ঈসা (আ.)-এর স্বভাব আর দায়িত্ব নিয়ে আসবেন। “মাহদী” নাম বোঝায়, তিনি আল্লাহর কাছ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্ত। আর “মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মেলা নাম” বোঝায়, তিনি মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি। নামগুলো একে অন্যের বিরোধী নয়, একে অন্যকে পূর্ণ করে।

“‘গোলাম আহমদ’ তো একটি পুরো নাম, শুধু ‘আহমদ’ নয়।”

উপমহাদেশে “গোলাম”, “আবদুল” ইত্যাদি শব্দ জুড়ে নাম রাখা খুব সাধারণ রীতি। “গোলাম আহমদ” মানে আহমদের সেবক। মজার বিষয় হলো, এই নামটিই পুরো সত্যটা বলে দেয়: তিনি স্বাধীন কোনো নবী নন, বরং আহমদ মুস্তফা (সা.)-এর গোলাম, তাঁরই অনুসারী, তাঁরই প্রতিচ্ছবি। নামের মূল শব্দ “আহমদ” মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে মিলে যায়, আর “গোলাম” শব্দটি তাঁর বিনয়ী অবস্থানকে স্পষ্ট করে।

সংক্ষেপে

  1. আবু দাউদের হাদীস (৪২৮২) বলে, প্রতিশ্রুত ব্যক্তির নাম মহানবী (সা.)-এর নামের সঙ্গে “মিলবে”, হুবহু এক হবে এমন বলা হয়নি।
  2. সূরা আল-জুমুআ ও বুখারীর হাদীস (৪৮৯৭) অনুযায়ী শেষ যুগে মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক দ্বিতীয় আগমন হবে; তাই তাঁর প্রতিচ্ছবির নাম তাঁর নামের সঙ্গে মিলবেই।
  3. “আহমদ” মহানবী (সা.)-এর নাম (সূরা আস-সাফ ৬১:৭), আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নামের মূল অংশও “আহমদ”।
  4. হাদীসে একই প্রতিশ্রুত ব্যক্তির জন্য একাধিক নাম এসেছে; এগুলো তাঁর গুণ ও দায়িত্বের পরিচয়।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.