১৮৮০ সালের কথা। ভারতবর্ষে ইসলামের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ চলছে। খ্রিষ্টান পাদ্রী আর আর্য সমাজের পণ্ডিতরা বই আর বক্তৃতায় কুরআন ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
এমন সময় কাদিয়ানের এক নিভৃতচারী মানুষ, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.), একটি বই লিখতে শুরু করলেন। নাম বারাহীনে আহমদীয়া। উদ্দেশ্য ছিল কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর সত্যতার পক্ষে মজবুত প্রমাণ তুলে ধরা। শুরুতে তিনি এটি পঞ্চাশ খণ্ডে লেখার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।
প্রথম চার খণ্ড কয়েক বছরের মধ্যে প্রকাশিত হয়। এরপর দীর্ঘ বিরতি। পঞ্চম খণ্ড লেখা হয় প্রায় তেইশ বছর পরে, আর তাতেই বইটি শেষ হয়।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, তিনি পঞ্চাশ খণ্ডের কথা বলে মানুষের কাছ থেকে অগ্রিম মূল্য নিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ খণ্ডে শেষ করে বললেন, “পাঁচ আর পঞ্চাশ সমান।” তাদের মতে এটি মানুষকে ঠকানো।
অভিযোগটি গুরুতর শোনায়। তাই আগে দেখা দরকার, তিনি আসলে কী লিখেছিলেন এবং কোন প্রসঙ্গে লিখেছিলেন।
বইয়ের ভূমিকা নিজেই কী বলে
বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডের ভূমিকায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) পুরো বিষয়টি খোলাখুলি বলেছেন। তাঁর কথার ভাবার্থ এমন:
“আমি প্রথমে এই বইয়ের পঞ্চাশ খণ্ড লেখার ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু পরে পঞ্চাশের বদলে পাঁচেই সন্তুষ্ট হলাম। আর পাঁচ (৫) ও পঞ্চাশের (৫০) মধ্যে পার্থক্য কেবল একটি বিন্দুর (০), তাই পাঁচ খণ্ডেই সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছে।”
এর ঠিক পরেই তিনি বিলম্বের কারণও বলেছেন। প্রথম চার খণ্ডে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। পঞ্চম খণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে সেগুলো পূর্ণ হয়েছে। তাই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বাস্তবে ঘটে যাওয়ার আগে পঞ্চম খণ্ড প্রকাশের সময় আসেনি।
টাকার প্রশ্নেও তিনি কিছু লুকাননি। তিনি লিখেছেন, প্রকাশিত চার খণ্ডের কিছু কপি বিভিন্ন মূল্যে বিক্রি হয়েছিল, আর কিছু বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছিল। দীর্ঘ দেরিতে যাঁরা অধৈর্য হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকে কটু কথা বলেছেন এবং নিজেদের দেওয়া টাকা ফেরতও নিয়ে নিয়েছেন।
অর্থাৎ, যে কেউ টাকা ফেরত চেয়েছে, সে ফেরত পেয়েছে। প্রতারক কখনো নিজের বইয়ে লিখে রাখে না যে মানুষ তার কাছ থেকে টাকা ফেরত নিয়েছে। আর যে বিষয়টিকে “লুকানো প্রতারণা” বলা হচ্ছে, সেটি তিনি নিজেই ছাপার অক্ষরে সবার সামনে রেখেছেন।
পাঁচ কীভাবে পঞ্চাশের সমান হয়?
গণিতে পাঁচ কখনো পঞ্চাশ হয় না। এ কথা সবাই জানে, তিনিও জানতেন। তাহলে তিনি কোন অর্থে কথাটি বললেন? উত্তরটি আমরা পাই মহানবী (সা.)-এর মেরাজের ঘটনায়।
মেরাজের রাতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে মহানবী (সা.)-এর উম্মতের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছিলেন। মূসা (আ.)-এর পরামর্শে মহানবী (সা.) বারবার আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে কমানোর আবেদন করেন। শেষে নামায হলো পাঁচ ওয়াক্ত। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন:
এখানে আল্লাহ তাআলা নিজেই বলছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পঞ্চাশের সমান। সংখ্যায় পাঁচ, কিন্তু পুরস্কার আর কল্যাণে পঞ্চাশ। আর আল্লাহর প্রথম কথাও এতে পূর্ণ হয়ে গেছে।
এই নিয়মের পেছনে আছে কুরআনের একটি সাধারণ ঘোষণা:
একটি ভালো কাজ দশগুণ হয়ে ফিরে আসে। পাঁচকে দশ দিয়ে গুণ করলে পঞ্চাশ। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ঠিক এই অর্থেই কথাটি বলেছেন: পাঁচ খণ্ড তার প্রভাব আর ফলাফলে পঞ্চাশ খণ্ডের কাজ করেছে।
আর তিনি যে বিন্দুর কথা বলেছেন, সেটিও ভাবার মতো। পঞ্চম খণ্ডে তিনি দেখিয়েছেন, আগের খণ্ডগুলোর ভবিষ্যদ্বাণী একে একে পূর্ণ হয়েছে। প্রমাণ এখন আর শুধু যুক্তিতে নয়, জীবন্ত নিদর্শনে। পঞ্চাশ খণ্ড যুক্তি লিখে যা দেখানো যেত, আল্লাহর নিদর্শন তার চেয়ে বেশি দেখিয়ে দিয়েছে।
ভূমিকায় তিনি আরেকটি কথা বলেছেন। চতুর্থ খণ্ডের পর পঞ্চম খণ্ড আসতে প্রায় তেইশ বছর লেগেছে। এই পুরো সময় তিনি বলে গেছেন, তাঁর কাছে আল্লাহর ওহী আসে।
তিনি প্রশ্ন রেখেছেন: যদি কেউ আল্লাহর নামে মিথ্যা ওহী বানায়, তাহলে আল্লাহ কি তাকে এত বছর বাঁচিয়ে রেখে, সাহায্য করে, তার বই শেষ করার সুযোগ দেন? এই সময়ে যাঁরা তাঁকে কাফির ও মিথ্যাবাদী বলেছিলেন, তাঁদের অনেকে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর কাজ এগিয়ে গেছে।
তাই পুরো ছবিটি দেখলে আপত্তিটি টেকে না। ইচ্ছার কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন, পরিবর্তনের কারণও নিজেই লিখেছেন, টাকা ফেরতের কথাও নিজেই স্বীকার করেছেন। আর “পাঁচ পঞ্চাশের সমান” কথাটি এসেছে সরাসরি মহানবী (সা.)-এর হাদীসের ভাষা থেকে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“কিন্তু টাকা তো নেওয়া হয়েছিল পঞ্চাশ খণ্ডের ভরসায়?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, ক্রেতারা পঞ্চাশ খণ্ডের আশায় টাকা দিয়েছিলেন, পাঁচ খণ্ড পেয়ে তাঁরা ঠকেছেন। চলুন ভূমিকাটি আবার দেখি। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, প্রকাশিত খণ্ডগুলোর কিছু বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়েছিল, কিছু বিনামূল্যে বিলানো হয়েছিল, আর যাঁরা অধৈর্য হয়েছেন তাঁরা টাকা ফেরত নিয়ে গেছেন।
অর্থাৎ যিনি মনে করেছেন তিনি ঠকেছেন, তাঁর টাকা ফেরতের পথ খোলা ছিল এবং অনেকে তা নিয়েছেনও। আর যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁরা পেয়েছেন এমন একটি বই, যার ভবিষ্যদ্বাণী তাঁদের চোখের সামনে পূর্ণ হয়েছে। ঠকানোর অভিযোগ এখানে দাঁড়ায় না।
“মেরাজের হাদীস তো আল্লাহর বিষয়, একটি বইয়ের সাথে তুলনা চলে কি?”
প্রশ্নটি ন্যায্য, কিন্তু এখানে তুলনাটি মর্যাদার নয়, নীতির। হাদীসটি শেখায়, কোনো কিছুর মূল্য তার সংখ্যায় নয়, তার ফলে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই নীতিটিই নিজের বইয়ের ক্ষেত্রে দেখিয়েছেন।
তা ছাড়া হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) ২০২২ সালের ২৫ মার্চের জুমুআর খুতবায় বলেছেন, হযরত মসীহ মওউদ (আ.) শুরুতে নির্দিষ্ট সংখ্যক খণ্ডের কথা বলেছিলেন; কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদিষ্ট হওয়ার পর তিনি ঘোষণা করেন, এই কাজ এখন আল্লাহর হাতে, তিনি যা শেখাবেন সেভাবেই বিষয়গুলো উপস্থাপিত হবে। যে কাজের চালক আল্লাহ, তার পরিমাপও তিনিই ঠিক করেন।
সংক্ষেপে
- বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডের ভূমিকায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) পঞ্চাশ খণ্ডের ইচ্ছা আর পাঁচে শেষ করার কথা নিজেই খোলাখুলি লিখেছেন।
- একই ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, অনেকে টাকা ফেরত নিয়েছেন; অর্থাৎ কিছুই লুকানো হয়নি।
- “এগুলো পাঁচ, আর এগুলোই পঞ্চাশ” কথাটি মেরাজের হাদীসে আল্লাহর বাণী (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৯)।
- কুরআন বলে, প্রতিটি সৎকর্মের পুরস্কার দশগুণ; সেই অর্থে পাঁচ খণ্ড পঞ্চাশের কাজ করেছে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Barahin-e-Ahmadiyya Part V · alislam.org
- Barahin-e-Ahmadiyya Part V (English, PDF) · alislam.org
- Truth of The Promised Messiah (as) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.