কোনো মানুষ সম্পর্কে জানার সবচেয়ে সৎ উপায় কী? তাঁর বিরোধীদের মুখে শোনা, নাকি তাঁর নিজের লেখা পড়া? আদালতেও আসামির নিজের জবানবন্দি শোনা হয়।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, মসীহ মওউদ ও ইমাম মাহদী (আ.) অনেক বই লিখে গেছেন। সেগুলোর পাতায় পাতায় মহানবী (সা.)-এর প্রতি এক গভীর ভালোবাসা। চলুন, কয়েকটি পাতা খুলি।
জীবন ও মৃত্যুর বিশ্বাস
তিনি লিখেছেন: “আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, যা নিয়ে আমরা এই জীবনে আছি এবং আল্লাহর কৃপায় যা নিয়েই এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে যাব, তা হলো আমাদের নেতা ও প্রভু মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) খাতামান নাবিয়্যীন ও খায়রুল মুরসালীন। তাঁর মাধ্যমে ধর্ম পূর্ণতা পেয়েছে, আর আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানোর নিয়ামত শিখরে পৌঁছেছে” (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬৯–১৭০)।
অন্যত্র তিনি অভিযোগের জবাব দিয়েছেন সোজাসুজি: “আমার ও আমার জামাতের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ যে আমরা মহানবী (সা.)-কে খাতামান নাবিয়্যীন মানি না, এটি এক বিরাট অপবাদ। যে শক্তি, প্রত্যয় আর উপলব্ধি নিয়ে আমরা তাঁকে খাতামান নাবিয়্যীন মানি, তা অন্যদের চেয়ে লক্ষ গুণ দৃঢ়” (মালফূযাত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২২৭–২২৮)।
মর্যাদায় সবার উপরে
তাঁর কাছে খাতামিয়্যাত মানে শুধু তালিকার শেষ নাম নয়। তিনি লিখেছেন, পবিত্র গুণাবলিতে কোনো নবীও মহানবী (সা.)-এর সমান হতে পারেন না; ফিরিশতারাও সেই উচ্চতার কথা কল্পনা করতে পারেন না, অন্য কারো কথা তো দূরের (বারাহীনে আহমদীয়া, তৃতীয় খণ্ড, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৬৮)।
তিনি আরও লিখেছেন, হৃদয়ের পবিত্রতা, প্রত্যয়, লজ্জাশীলতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি আর আল্লাহর প্রেমে মহানবী (সা.) সব নবীকে ছাড়িয়ে গেছেন; তাই তাঁর হৃদয় এমন ওহী পাওয়ার যোগ্য হয়েছে, যা আগের ও পরের সব ওহীর চেয়ে পূর্ণ ও শক্তিশালী (সুরমা চশমে আরিয়া, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৭১, টীকা)।
মোহরের আসল অর্থ
তাহলে “নবীগণের মোহর” মানে কী? তিনি ব্যাখ্যা করেছেন: তিনি নবীগণের মোহর এই কারণে নন যে তাঁর পরে কেউ আধ্যাত্মিক কল্যাণ পাবে না; বরং এই কারণে যে তাঁর মোহরের সত্যায়ন ছাড়া কেউ কোনো কল্যাণ পাবে না, আর তাঁর উম্মতের জন্য আল্লাহর সঙ্গে বাক্যালাপের দরজা কখনো বন্ধ হবে না। আর কোনো নবীকে এমন মোহর দেওয়া হয়নি (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২৯–৩০)।
তিনি আরও লিখেছেন: সব নবুয়্যত তাঁর মধ্যে শিখরে পৌঁছেছে, সব শরীয়ত তাঁর শরীয়তে পূর্ণ হয়েছে। তবে এক ধরনের নবুয়্যত শেষ হয়নি: যা মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের ফলে পাওয়া যায় এবং তাঁর প্রদীপ থেকে আলো নেয়; কারণ তা তাঁরই নবুয়্যতের প্রতিচ্ছবি (চশমায়ে মারেফাত, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২৩, পৃষ্ঠা ৩৪০)।
আর নিজের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: এই সম্মান আমি পেয়েছি শুধু মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের কারণে। আমি যদি তাঁর উম্মতের সদস্য ও অনুসারী না হতাম, তাহলে আমার নেক আমল পৃথিবীর সব পাহাড়ের সমান হলেও এই বাক্যালাপের সম্মান পেতাম না। মুহাম্মদী নবুয়্যত ছাড়া সব নবুয়্যত শেষ হয়েছে। কোনো শরীয়তবাহী নবী আসতে পারেন না। শরীয়তবিহীন নবী আসতে পারেন, তবে তাঁকে প্রথমে উম্মতী হতে হবে। এই অর্থে আমি উম্মতীও, নবীও (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়্যা, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৪১১–৪১২)।
এই উদ্ধৃতিগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি পরিষ্কার ছবি ফুটে ওঠে। একদিকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা: তিনি সবার উপরে, তাঁর সমান কেউ নেই। অন্যদিকে নিজের সম্পর্কে গভীর বিনয়: যা কিছু পেয়েছি, তাঁরই দান। যিনি নিজেকে মনিবের ছায়া বলেন, তিনি মনিবের মর্যাদা কমাতে পারেন না। বরং তাঁর পুরো দাবিটাই মহানবী (সা.)-এর কল্যাণের জীবন্ত সাক্ষ্য।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
তিনি তো একসময় নবী হওয়ার কথা অস্বীকার করেছিলেন, পরে দাবি করলেন?
এই প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন ১৯০১ সালে লেখা “এক গলতী কা ইযালা” (একটি ভুলের অপনোদন) পুস্তিকায়। আলইসলাম ডট অর্গে এর ইংরেজি অনুবাদের পরিচিতিতে তাঁর কথাটি তুলে ধরা হয়েছে: যখনই আমি নবী বা রসূল হওয়ার কথা অস্বীকার করেছি, তা শুধু এই অর্থে যে আমি কোনো স্বাধীন শরীয়ত আনিনি এবং আমি স্বাধীন নবী নই। অর্থাৎ অস্বীকার ছিল এক ধরনের নবুয়্যতের, স্বীকার আরেক ধরনের। দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
তিনি কি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর সমকক্ষ ভেবেছেন?
উপরের উদ্ধৃতিগুলোই উত্তর। যিনি লেখেন, কোনো নবী, এমনকি ফিরিশতারাও মহানবী (সা.)-এর সমান হতে পারেন না; যিনি লেখেন, তাঁর অনুসারী না হলে পাহাড়-সমান আমলেও কিছু পেতাম না; তিনি নিজেকে সমকক্ষ ভাবতে পারেন না। তিনি নিজেকে দেখেছেন একজন সেবক ও প্রতিচ্ছবি হিসেবে, যাঁর সব কিছু মনিবের দান।
“যিল্লী” বা “বুরূযী” নবী, এসব কি নতুন বানানো শব্দ?
না। আলইসলাম ডট অর্গের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এই ধারণাগুলো ইসলামী জ্ঞানচর্চায় বহু শতাব্দী ধরে পরিচিত। মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) তাঁর মাকতুবাতে বুরূযকে পুনর্জন্মবাদ থেকে আলাদা করে ব্যাখ্যা করেছেন (দ্বিতীয় খণ্ড, মাকতুব ৫৮), আর লিখেছেন, বেলায়েতের মর্যাদা নবুয়্যতের ছায়া বা যিল্ল (দ্বিতীয় খণ্ড, মাকতুব ৭১)। ইবনে আরাবী (রহ.)-এর ব্যাখ্যায় শরীয়তবাহী নবুয়্যত ও রিসালাত শেষ হয়েছে, কিন্তু বেলায়েতের নবুয়্যত চালু আছে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই পরিচিত পরিভাষাগুলোই ব্যবহার করেছেন, যেন বোঝা যায় তাঁর নবুয়্যত মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতের ছায়া, আলাদা কিছু নয়।
সংক্ষেপে
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মহানবী (সা.)-কে খাতামান নাবিয়্যীন ও খায়রুল মুরসালীন বলে জীবন ও মৃত্যুর বিশ্বাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
- তাঁর মতে কোনো নবী বা ফিরিশতা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদায় পৌঁছাতে পারেন না।
- মোহরের অর্থ: তাঁর সত্যায়ন ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই, আর তাঁর উম্মতের জন্য আল্লাহর বাক্যালাপের দরজা খোলা।
- শরীয়তবাহী ও স্বাধীন নবুয়্যত শেষ; শুধু পূর্ণ আনুগত্য থেকে জন্মানো উম্মতী নবুয়্যত সম্ভব, আর এই অর্থেই তিনি উম্মতী নবী।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Finality of Prophethood · alislam.org
- Advent of a Prophet within the Ummah is Not in Conflict with ‘Khatm-e-Nubuwwat’ · alislam.org
- A Misconception Removed · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.