ছোটবেলায় অনেকেই গল্পটি শুনেছি। ইহুদিরা ঈসা (আ.)-কে ধরতে এল। তিনি একটি ঘরে ছিলেন। এক শত্রু তাঁকে আনতে ঘরে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ সেই লোকটির চেহারা ঈসা (আ.)-এর মতো করে দিলেন, আর ঈসা (আ.)-কে ছাদ দিয়ে আকাশে তুলে নিলেন। পরে লোকেরা সেই শত্রুকেই ঈসা (আ.) ভেবে ক্রুশে চড়াল।
গল্পটি নাটকীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কুরআন কি এমন কিছু বলেছে? চলুন, যে আয়াত থেকে এই গল্প টানা হয়, সেটি নিজেই পড়ে দেখি।
ইহুদিরা কী প্রমাণ করতে চেয়েছিল?
আয়াতটি শুরু হয়েছে ইহুদিদের একটি গর্বের দাবি দিয়ে: “আমরা মসীহকে হত্যা করেছি।” কেন তারা এত জোর দিয়ে এ কথা বলত?
কারণ তাওরাতে লেখা আছে, যাকে গাছে (কাঠে) ঝোলানো হয়, সে আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত (দ্বিতীয় বিবরণ ২১:২৩)। ইহুদিরা ভাবত, ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে মেরে ফেলতে পারলে প্রমাণ হবে তিনি সত্য নবী নন, বরং অভিশপ্ত। alislam.org-এর তফসীরে এই প্রেক্ষাপটটি বিস্তারিত বলা হয়েছে।
কুরআন এই দাবির জবাব দিচ্ছে: তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি, ক্রুশে বিদ্ধ করে মারতেও পারেনি। লক্ষ করুন, কুরআন বলছে না যে তাঁকে ক্রুশে চড়ানোই হয়নি। আরবি “সালাবা” শব্দের অর্থ ক্রুশে ঝুলিয়ে মেরে ফেলা। তাই আয়াতটি অস্বীকার করছে ক্রুশে তাঁর মৃত্যু, ক্রুশে ঝোলানো নয়।
“শুব্বিহা লাহুম”: কাকে অনুরূপ করা হয়েছিল?
এবার আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ: ওয়া লাকিন শুব্বিহা লাহুম, অর্থাৎ “বরং তাদের কাছে তাঁকে অনুরূপ করা হয়েছিল।”
প্রশ্ন হলো, কাকে অনুরূপ করা হয়েছিল? আয়াতে তো একজনেরই কথা হচ্ছে, তিনি ঈসা মসীহ (আ.)। অন্য কোনো লোকের নাম বা ইঙ্গিত পুরো প্রসঙ্গে কোথাও নেই। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ীও এই শব্দের লুকানো কর্তা ঈসা (আ.) ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না। alislam.org-এর তফসীর তাই স্পষ্ট করে বলে, যে লোকের কোনো উল্লেখই আয়াতে নেই, তাকে জোর করে প্রসঙ্গে ঢোকানোর সুযোগ নেই।
তাহলে ঈসা (আ.)-কে কিসের অনুরূপ করা হয়েছিল? প্রসঙ্গই উত্তর দেয়: ক্রুশে নিহত মানুষের মতো। তিনি অচেতন অবস্থায় ক্রুশ থেকে নেমেছিলেন, আর শত্রুরা তাঁকে মৃত ভেবে ভুল করেছিল। আহমদীয়া বাংলা অনুবাদও বন্ধনীতে এটিই বলে: “(ক্রুশ-বিদ্ধ মৃতের) অনুরূপ”।
শব্দটির আরেকটি অর্থও হয়: “বিষয়টি তাদের কাছে সন্দেহজনক করে দেওয়া হয়েছিল।” ইতিহাসও তা-ই বলে। ইহুদিরা নিজেরাই নিশ্চিত ছিল না। তাই তো তারা পিলাতের কাছে গিয়ে কবর পাহারার আবেদন করেছিল (মথি ২৭:৬৩-৬৪)।
সেই জনপ্রিয় গল্পের কিছু প্রশ্ন
এবার গল্পটির দিকে আবার তাকানো যাক। একটু ভাবলেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।
প্রথম প্রশ্ন: গল্পটি জানল কে? ঘরে ছিলেন মাত্র দুজন। একজন আকাশে চলে গেলেন, অন্যজনকে ক্রুশে মেরে ফেলা হলো। তাহলে পুরো ঘটনার সাক্ষী রইল কে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: আল্লাহ কি তাঁর একজন প্রিয় নবীর চেহারা এক শত্রুকে দিয়ে দেবেন? আর অন্য কাউকে যদি বলি দিতেই হয়, তাহলে ঈসা (আ.)-কে আবার আকাশে তোলার দরকার কী ছিল?
তৃতীয় প্রশ্ন: এই গল্প মানলে ইহুদিরা সত্যিই বিশ্বাস করবে যে তারা মসীহকে ক্রুশে মেরেছে, কারণ তারা তো তা-ই দেখেছে। তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা যে তাঁকে অভিশপ্ত ভেবে অস্বীকার করছে, সেই ভুল বোঝানোর দায় কার ঘাড়ে যায়? নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহ কি কাউকে এভাবে ধোঁকা দেন?
alislam.org-এর একটি গবেষণা প্রবন্ধ দেখিয়েছে, এই “চেহারা বদলের” গল্পগুলো কুরআন বা হাদীস থেকে আসেনি। এগুলোর বেশিরভাগ বর্ণিত হয়েছে নতুন মুসলমান হওয়া ইহুদি-খ্রিস্টানদের সূত্রে। এমনকি গল্পের একাধিক ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ আছে, যা নিজেই এর দুর্বলতা প্রমাণ করে। প্রবন্ধটির মতে, এর শিকড় প্রাচীন কিছু খ্রিস্টান গোষ্ঠীর বিশ্বাসে, যারা বলত ক্রুশে আসলে অন্য কেউ ছিল।
তাহলে আয়াতটির সহজ অর্থ দাঁড়াল: ইহুদিরা ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে মেরে অভিশপ্ত প্রমাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ করেছেন। তিনি ক্রুশে মারা যাননি, শুধু মৃতের মতো দেখা গিয়েছিল। পরের আয়াতে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, অভিশপ্ত হওয়া তো দূরের কথা, তিনি তাঁকে নিজের দিকে সম্মানিত করেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
আল্লাহ তো বলেছেন, তিনি বনী ইসরাঈলকে ঈসা (আ.) থেকে রুখে রেখেছিলেন। তাহলে তারা তাঁকে ক্রুশে ঝোলাল কীভাবে?
এখানে কেউ কেউ সূরা আল-মায়েদার একটি আয়াত পেশ করেন, যেখানে আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে তাঁর নেয়ামত স্মরণ করাচ্ছেন: “যখন আমি বনী ইস্রাঈলকে তোমা হইতে রুখিয়া রাখিয়াছিলাম” (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১১)। তাঁরা বলেন, এর মানে শত্রুরা তাঁকে ছুঁতেই পারেনি।
চলুন দেখি, কুরআন একই ভাষা আর কোথায় ব্যবহার করেছে। মহানবী (সা.)-এর সাহাবীদের উদ্দেশে আল্লাহ বলছেন:
অথচ আমরা জানি, প্রাথমিক মুসলমানরা কত নির্যাতন সয়েছেন, উহুদের যুদ্ধে মহানবী (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। alislam.org-এর প্রবন্ধে তাই ব্যাখ্যা করা হয়েছে, “রুখে রাখা” মানে শত্রু কোনো কষ্টই দিতে পারবে না, তা নয়। এর মানে, শত্রু তার আসল উদ্দেশ্যে সফল হবে না। ঈসা (আ.)-এর শত্রুদের উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে ক্রুশে মেরে অভিশপ্ত প্রমাণ করা। সেটিই আল্লাহ রুখে দিয়েছেন।
অনেক পুরোনো তফসীরেই তো চেহারা বদলের ঘটনা লেখা আছে?
হ্যাঁ, আছে। কিন্তু কোথা থেকে এসেছে, সেটাই আসল প্রশ্ন। alislam.org-এর গবেষণা প্রবন্ধ দেখিয়েছে, তফসীরে তাবারীতে এই গল্পের একটি বর্ণনা এসেছে ওয়াহাব নামের এক ব্যক্তির সূত্রে, যিনি ইহুদি ধর্ম থেকে ইসলামে এসেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, ঈসা (আ.)-এর সতেরো জন শিষ্যের সবার চেহারাই ঈসা (আ.)-এর মতো করে দেওয়া হয়েছিল। আরেক বর্ণনায় একজন সঙ্গী স্বেচ্ছায় তাঁর চেহারা নিতে রাজি হন। আরেকটিতে চেহারা পায় এক শত্রু।
একই ঘটনার এতগুলো পরস্পরবিরোধী রূপ, আর একটিরও উৎস মহানবী (সা.) নন। কুরআনের আয়াতের অর্থ এমন কাহিনী দিয়ে ঠিক করা যায় না, যার পেছনে নবী (সা.)-এর একটি কথাও নেই।
সংক্ষেপে
- ইহুদিরা ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে মেরে তাওরাত অনুযায়ী “অভিশপ্ত” প্রমাণ করতে চেয়েছিল।
- কুরআন অস্বীকার করেছে ক্রুশে তাঁর মৃত্যু, ক্রুশে ঝোলানো নয়।
- “শুব্বিহা লাহুম” কথাটি ঈসা (আ.)-কেই নির্দেশ করে: তাঁকে ক্রুশে নিহতের মতো দেখানো হয়েছিল।
- অন্য কারো চেহারা বদলের গল্প কুরআন-হাদীসে নেই; এটি বাইরের উৎস থেকে আসা।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Holy Quran 4:158 (with commentary) · alislam.org
- Death of Hazrat Jesus (as) · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.