তেরোশ বছর ধরে মক্কা আর মদিনার মধ্যে যাতায়াতের একটাই উপায় ছিল: উট। প্রতি বছর হজের মৌসুমে লাখো উট মরুভূমির পথ ধরে হাজীদের নিয়ে চলত। কয়েক সপ্তাহের কঠিন যাত্রা, পথে রোদ, তৃষ্ণা আর ডাকাতের ভয়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সেই মরুভূমিতে একটি নতুন শব্দ শোনা গেল: লোহার লাইনের ওপর বাষ্পীয় ইঞ্জিনের হুইসেল।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর কয়েকটি লেখায় বলেছেন, মক্কা-মদিনায় রেলপথ তৈরি হচ্ছে (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ১০৮; খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৪৯)। আরেক জায়গায় তিন বছরের মধ্যে রেলপথ তৈরি হওয়ার কথাও এসেছে (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ১৯৫)। বিরোধীরা বলেন, তাঁর জীবদ্দশায় মক্কা-মদিনার মধ্যে কোনো রেলপথ চালু হয়নি, তাই কথাটি ভুল ছিল।
তিনি আসলে কী লিখেছিলেন
১৯০০ সালে প্রকাশিত আরবাঈন পুস্তকে তিনি একটি টীকায় লিখেছেন, যার ভাবার্থ (alislam.org-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে):
“এখন মক্কা মুআযযামা ও মদিনা মুনাওয়ারার মানুষের জন্য একটি বড় নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছে। তেরোশ বছর ধরে মক্কা ও মদিনার মধ্যে যাতায়াতের বাহন ছিল উট… এই উটগুলো সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে একটি ভবিষ্যদ্বাণী আছে, যা সবাই মানে: এমন সময় আসছে যখন এগুলো অকেজো হয়ে যাবে, কেউ এগুলোতে চড়বে না… এটি কত বড় ভবিষ্যদ্বাণী, যা মসীহের যুগ ও প্রতিশ্রুত মসীহের আবির্ভাবের নিদর্শন হওয়ার কথা ছিল, আর যা রেলগাড়ির আগমনের মাধ্যমে পূর্ণ হয়েছে!”
একই বইয়ের আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন, মানুষ এখন দেখছে মক্কা ও মদিনায় বড় উৎসাহের সাথে রেলপথ প্রস্তুত হচ্ছে, আর উটকে বিদায় জানানোর সময় এসে গেছে।
অর্থাৎ তাঁর মূল কথা দুটি: এক, কুরআন (৮১:৫) ও সহীহ মুসলিমের হাদীস অনুযায়ী মসীহের যুগে উট বাহন হিসেবে পরিত্যক্ত হবে; দুই, সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার কাজ মক্কা-মদিনার পথেও শুরু হয়ে গেছে।
ইতিহাস কী বলে
সে সময় মক্কা ও মদিনা ছিল উসমানীয় (তুর্কি) খিলাফতের অধীনে। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৯০০ সালে দামেস্ক থেকে হিজায পর্যন্ত একটি রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু করেন, যার নাম হিজায রেলওয়ে। এর লক্ষ্য ছিল হাজীদের যাত্রা সহজ করা। পরিকল্পনা ছিল দামেস্ক থেকে মদিনা, তারপর মদিনা থেকে মক্কা।
হযরত মির্যা সাহেব যখন লিখছিলেন, তখন এই কাজ পুরোদমে চলছিল। সারা মুসলিম বিশ্ব থেকে এর জন্য চাঁদা তোলা হচ্ছিল। ১৯০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রেলপথটি মদিনা পর্যন্ত চালু হয়। অর্থাৎ “রেলপথ তৈরি হচ্ছে” কথাটি ছিল অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধের সময় রেলপথটি বারবার আক্রমণের শিকার হয়, আর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে মদিনা-মক্কা অংশের কাজ আর এগোয়নি।
কিন্তু গল্প সেখানে শেষ হয়নি। ২০১৮ সালে মক্কা আর মদিনার মধ্যে হারামাইন দ্রুতগতির রেলপথ চালু হয়েছে। আজ হাজীরা উটের পিঠে কয়েক সপ্তাহ নয়, ট্রেনে কয়েক ঘণ্টায় দুই পবিত্র শহরের মধ্যে যাতায়াত করেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) ২০১৯ সালের ২২ মার্চের জুমুআর খুতবায় বলেছেন, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী মদিনা ও মক্কার মধ্যে এখন রেলপথ চালু হয়েছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“তাঁর জীবদ্দশায় তো মক্কা পর্যন্ত রেল যায়নি”
ঠিক, আর তিনি তা দাবিও করেননি। তিনি লিখেছেন রেলপথ “তৈরি হচ্ছে”, “প্রস্তুত হচ্ছে”, আর সেটি ছিল বাস্তব সত্য: হিজায রেলওয়ের কাজ তখন চলছিল, আর তাঁর ইন্তেকালের কয়েক মাস পরেই রেল মদিনায় পৌঁছায়। তাঁর আসল যুক্তি ছিল মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী: মসীহের যুগে উট পরিত্যক্ত হবে। সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হতে শুরু করেছিল তাঁর চোখের সামনে, আর আজ তা পুরোপুরি পূর্ণ।
“তিন বছরের কথাটির কী হবে?”
বিরোধীরা রূহানী খাযায়েনের ১৭ খণ্ডের ১৯৫ পৃষ্ঠার একটি বাক্য তুলে ধরেন, যেখানে তিন বছরে রেলপথ তৈরি হওয়ার কথা আছে। সে সময় হিজায রেলওয়ের কাজ দ্রুত এগোচ্ছিল, আর কয়েক বছরের মধ্যেই লাইন মদিনা পর্যন্ত পৌঁছেও গিয়েছিল। যে কাজ একটি সাম্রাজ্যের হাতে, তার সময়সূচি যুদ্ধ, অর্থসংকট আর রাজনীতির কারণে বদলে যেতে পারে। কিন্তু যে ভবিষ্যদ্বাণী তিনি প্রমাণ হিসেবে দিয়েছেন, সেটি কোনো সাম্রাজ্যের সময়সূচির ওপর নির্ভর করে না: উট পরিত্যক্ত হবে, আর তা হয়েছে।
“এটি তো এমনিতেই ঘটত, আধুনিক যুগে রেল সব জায়গাতেই এসেছে”
ঠিক এটাই মূল কথা। মহানবী (সা.) চৌদ্দশ বছর আগে বলেছিলেন, মসীহের যুগে এমন পরিবর্তন আসবে যে উট আর বাহন থাকবে না। তখন কেউ এর কল্পনাও করতে পারত না। আজ যা “স্বাভাবিক” মনে হয়, সেটিই ছিল তখনকার সবচেয়ে অস্বাভাবিক ভবিষ্যদ্বাণী। আর সেই পরিবর্তনের যুগেই একজন মানুষ দাঁড়িয়ে বলেছেন, “আমিই সেই মসীহ।” নিদর্শন আর দাবিদার একই সময়ে মিলে যাওয়াই এখানে আসল সাক্ষ্য।
সংক্ষেপে
- আরবাঈনে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, কুরআন (৮১:৫) ও সহীহ মুসলিম অনুযায়ী মসীহের যুগে উট পরিত্যক্ত হবে, আর মক্কা-মদিনায় রেলপথ প্রস্তুতির মাধ্যমে তা পূর্ণ হতে চলেছে।
- ১৯০০ সালে হিজায রেলওয়ের কাজ শুরু হয়; ১৯০৮ সালে তা মদিনা পর্যন্ত চালু হয়।
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনে মক্কা অংশ থেমে যায়; ২০১৮ সালে মক্কা-মদিনা দ্রুতগতির রেলপথ চালু হয়েছে।
- তাঁর যুক্তির মূল ছিল মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী, যা আজ পুরোপুরি পূর্ণ।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Arba‘in – Forty Announcements (English translation, PDF) · alislam.org
- The Promised Messiah (as): The need for The Imam · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.